কৃষি ও অর্থনীতি
দুই সপ্তাহে দাম অর্ধেকে, দিশেহারা পাবনার চাষিরা
বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের পেঁয়াজের রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাবনার বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন শুধুই কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। যে মাটির পেঁয়াজ সারা দেশের রান্নাঘরের চাহিদা মেটায়, সেই মাটির কারিগররাই আজ লোকসানের চোরাবালিতে আটকে গেছেন। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম অর্ধেকে নেমে আসায় উত্তরের এই জনপদের লাখ লাখ চাষি এখন দিশেহারা।
সরেজমিনে দেশের অন্যতম বৃহৎ পেঁয়াজের হাট সাঁথিয়ার বনগ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। কাকডাকা ভোরে পেঁয়াজের পসরা নিয়ে কৃষকরা হাটে এলেও তাদের চোখে-মুখে নেই হাসির ঝিলিক। দুই সপ্তাহ আগেও যে মুড়িকাটা পেঁয়াজ মণপ্রতি ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে তা ১,০০০ টাকায় ঠেকেছে। নিম্নমানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়।
বনগ্রাম হাটের ‘মামা-ভাগ্নে’ আড়তের আড়তদার সুজন আলী জানান, হঠাৎ দরপতন ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে ব্যস্ততম এই হাটের অনেক আড়ত ঘর এখন জনশূন্য ও খাঁ খাঁ করছে।
কৃষকদের তথ্যমতে, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষে বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিক মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। যারা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেন, তাদের ব্যয় ৪০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। বর্তমান বাজারমূল্যে প্রতি মণে চাষিদের ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
সুজানগরের ঘোড়াদহ গ্রামের চাষি খালেক মোল্লা আক্ষেপ করে বলেন, “সার আর বীজের যে দাম, তাতে ১ হাজার টাকার নিচে মণ বিক্রি করলে আমাদের ভিটেমাটি বেচতে হবে।” একই সুরে সদর উপজেলার চরতারাপুর গ্রামের রেজাউল করিম বলেন, “উৎপাদন খরচই উঠছে না, আমরা বাঁচবো কীভাবে?” অনেক প্রান্তিক চাষি মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার পাবনায় ৪৪ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। এর একটি বিশাল অংশ আসে সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলা থেকে। তবে বর্তমানের এই দরপতন আসন্ন ‘হালি’ পেঁয়াজের বাজার নিয়ে চাষিদের মনে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। লোকসানের ভয়ে অনেক চাষি এখন পেঁয়াজ ছেড়ে সরিষা বা গমের আবাদে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশ ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহজাহান আলী বাদশা মনে করেন, চাষি ও ভোক্তা উভয়কে বাঁচাতে হলে উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের পেঁয়াজ চাষ আরও বাড়াতে হবে। কৃষিবিদ জাফর সাদেক বলেন, “পেঁয়াজ চাষিদের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং টেকসই কৃষি নীতি এখন সময়ের দাবি।”
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক। তিনি বলেন, “আবহাওয়া ভালো থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে এবং আশা করছি চাষিরা শেষ সময়ে বাজারে ভালো দাম পাবেন।”
এখন দেখার বিষয়, উত্তরের এই ‘সাদা সোনা’খ্যাত পেঁয়াজ চাষিদের মুখে শেষ পর্যন্ত হাসির ঝিলিক ফোটে কি না।
