আলোকিত পাবনা
পাবনায় ৬ বছর ধরে দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষকে সাহরি দেয় তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশন
আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা
পাবনা শহরে গত ৬ বছর ধরে দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে সাহরি বিতরণ করে চলেছেন দেওয়ান মাহবুব। করোনার কঠিন সময়ে যে মানবিক উদ্যোগ তিনি শুরু করেছিলেন, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলতি বছরও তা চালু রেখেছেন। মানবিক এই কাজের জন্য তিনি এখন স্থানীয়দের কাছে ‘মাহবুব ভাই’ নামেই পরিচিতি লাভ করেছেন।
প্রতিদিন রাত ১টা বাজলেই সাহরির প্যাকেট নিয়ে শহরের পথে নামেন মাহবুব। কখনো অটোরিকশায়, কখনো পায়ে হেঁটে তিনি পৌঁছে যান শহরের বিভিন্ন মোড়ে। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, অনন্ত মোড়, রায় বাহাদুর গেট ও মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটসহ অন্তত সাতটি পয়েন্টে চলে তার এই সাহরি বিতরণ। তার ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে আসেন ছিন্নমূল মানুষ থেকে শুরু করে রাতের পাহারাদার ও রিকশাচালকরা।
মানবিকতার ডাকে গত ৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাহরি বিতরণ করে চলেছেন দেওয়ান মাহবুব। তিনি মূলত সেসব মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, যাদের বাড়ি দূরে কিংবা যারা কাজের প্রয়োজনে রাত জেগে রাজপথে থাকেন। মাহবুব জানান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নৈশপ্রহরী, ভাসমান মানুষ, গভীর রাতে বাড়তি আয়ের আশায় রিকশা চালানো চালক এবং পথচারীদের মাঝে তারা নিয়মিত সাহরির প্যাকেট পৌঁছে দিচ্ছেন। এমনকি হাসপাতালে থাকা রোগীর স্বজনরাও যাতে নির্বিঘ্নে রোজা রাখতে পারেন, সেজন্য তাদের হাতেও তুলে দেওয়া হচ্ছে এই খাবার।
এমন উদ্যোগ নেয়ার কারণ হিসেবে জানান, করোনার অব্যাহত বিস্তার ও লকডাউনের জন্য বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েছিলেন। অনেকেরই পবিত্র রমজানে সাহরি খাবার মত সামর্থ্য ছিল না। এছাড়া করোনার কারণ রাতে খাবার হোটেল বন্ধ থাকায় পকেটে টাকা থাকলেও হাসপাতালের রোগীর অভিভাবকরা সাহরি কিনে খেতে পারছিলেন না। হাসপাতালে নিয়ম অনুযায়ী শুধু রোগীদের খাবার দেয়া হয়। তাই অনেকেরইই শুধু সাহরি খাবারের অভাবে রোজা রাখা সমস্য হচ্ছিল। এসব চিন্তা থেকেই সাহরি সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
তিনি জানান, নিজেদের অর্থ, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন, পরিচিত মানুষ সহযোগিতা করছেন বলেই তা সম্ভব হচ্ছে। তার কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিয়েছেন তৌহিদুর রহমান লিমন, রাইসুল ইসলাম লিমন, মাশফিক, জিসান, আরেফিন সুনাম। তিনি জানান, প্রতি রাতে দুটো অটোবাইক ভাড়া করে তার নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবকেরা হাসপাতালসহ শহরের নানাস্থানে অসহায় মানুষদের মাঝে এ খাবার বিতরণ করছেন। খাবার গ্রহনকারীদের তালিকায় রয়েছেন অসহায় রোগী ও তাদের সাথে থাকা স্বজনেরা, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথে থাকা প্রহরী, রিকশাচালক, বিভিন্ন মার্কেটে থাকা নৈশপ্রহরী, রাস্তায় থাকা ভাসমান মানুষজন। সাহরির খাদ্য তালিকায় থাকে সাদা ভাত, মুরগী, সবজি ও ডাল। আবার কোনোদিন সাদা ভাত, মাছ, সবজি ও ডাল। এছাড়া খিচুড়ি – ডিম ভুনাও দেয়া হয়। দেওয়ান মাহবুব জানান, তিনি তার টিমসহ সাহরীর শেষ সময়ের বেশ আগেই বের হন। কারণ খাবার প্যাকেট পৌঁছে দিতেও বেশ সময় লাগে।
দেওয়ান মাহবুবের এই পরোপকারী মানসিকতার শেকড় লুকিয়ে আছে তার পরিবারে। তার বাবা অধ্যাপক দেওয়ান আজিজুল ইসলাম নিজেও একজন মানবিক ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। মাহবুব জানান, বাবার আদর্শ ও প্রেরণাই তাকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে সাহস জোগায়। পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থনে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশন’। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই এখন রমজানে সাহরি বিতরণসহ সারা বছর নানাবিধ সেবামূলক কাজ পরিচালনা করা হয়।
প্রতিদিন এই বিশাল আয়োজনের পেছনে থাকে নিপুণ পরিকল্পনা। মাহবুব ও তার একদল নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবী আগের দিন থেকেই শুরু করেন অর্থ ও দান সংগ্রহের কাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বিত্তবানদের কাছে আবেদন জানান তিনি। কখনো কখনো তহবিলের সংকট দেখা দেয়। মাহবুব বলেন, অনেক রাত এমন যায় যখন চিন্তায় থাকি কাল সাহরি দিতে পারব তো? কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো দাতার মাধ্যমে ব্যবস্থা হয়ে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে কাজটা টিকে আছে।
বাজার করা থেকে শুরু করে রান্নার তদারকি এবং প্যাকিং—সবকিছুই তারা নিজেরা করেন। রাত ১টা বাজলেই সাহরির প্যাকেট নিয়ে অটোরিকশায় বেরিয়ে পড়েন তারা। শুধু রাজপথ নয়, পাবনা জেনারেল হাসপাতালে থাকা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছেও পৌঁছে যায় মাহবুবের সাহরি। প্রতি রাতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ প্যাকেট সাহরি বিতরণ করা হয়, যেখানে প্রতি প্যাকেটের খরচ পড়ে প্রায় ৭০ টাকা।
শহরের আব্দুল হামিদ সড়কের নৈশপ্রহরী সাইদুল ইসলাম বলেন, আমাদের বাড়ি অনেক দূরে। রাত জেগে ডিউটি করি, প্রচণ্ড গরমে বাড়ি থেকে খাবার আনলে নষ্ট হয়ে যায়। গত চার বছর ধরে মাহবুব ভাই আমাদের সাহরি দিয়ে যাচ্ছেন। সাহরি পেয়ে আমাদের খুব উপকার হয়।
একই সুর রিকশাচালক আব্দুল মজিদের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, আগে তো চিড়া-মুড়ি খেয়ে রোজা রাখতাম। এখন মাহবুব ভাইয়ের বদৌলতে পেটভরে ভাত খেয়ে রোজা রাখতে পারছি।
শুধুই সাহরি নয়, তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম এখন অনেক বিস্তৃত। সপ্তাহের দুই দিন বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল স্থাপন, অসহায় নারীদের সেলাই মেশিন এবং মুরগি ও ছাগল বিতরণ করে তাদের স্বাবলম্বী করা হচ্ছে। করোনাকালে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ২২টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। এছাড়া কোরবানির ঈদে দুস্থদের মাঝে গোশত বিতরণও নিয়মিত করে যাচ্ছেন তারা।
চাহিদার তুলনায় যোগান সীমিত হওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ ঝরল মাহবুবের কণ্ঠে। প্রতি রাতে চাহিদা থাকে ৩৫০-৪০০ প্যাকেটের, কিন্তু সামর্থ্যের অভাবে আমরা অত প্যাকেট দিতে পারি না। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় অনেককেই খালি হাতে ফেরাতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। এই মহতী উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে তিনি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
পাবনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস এই কাজের প্রশংসা করে বলেন, মাহবুব ও তার দল অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজটি করছে। আমি নিজেও তার এ মহতী কাজে শরিক হয়েছি। প্রতি রাতে সাহরি ও সন্ধ্যায় ইফতারি পেয়ে বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।
পাবনা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রাশেদ কবীর এই মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, পাবনা শহরে দেওয়ান মাহবুব দীর্ঘ সময় ধরে নিভৃতে একটি মহতী কাজ করে চলেছেন। অসহায় ও শ্রমজীবী মানুষের মুখে সাহরি তুলে দেওয়ার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আমরা সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তার এই মানবিক কাজকে সাধুবাদ জানাই।
