মত-দ্বিমত
পদ্মার ঢেউ আর ইতিহাসের পলি: ঐতিহ্যের বাঁকে অনন্য পাবনা
উত্তর জনপদের প্রবেশদ্বার বলা হয় পাবনাকে। পদ্মা আর যমুনার পলিমাটিতে বেড়ে ওঠা এই জনপদ কেবল কৃষিতেই নয়, রাজনীতি, সাহিত্য আর স্থাপত্যের ঐতিহ্যে অনন্য। বাংলার মানচিত্রে পাবনা মানেই এক সমৃদ্ধ জনপদ, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে কয়েকশ বছরের পুরনো ইতিহাস।
পাবনার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ। লোকশ্রুতি আছে, ‘পাবনী’ নামক এক প্রাচীন গঙ্গার শাখা থেকে এই নামের উৎপত্তি। আবার অনেকে মনে করেন, আদিবাসীদের ভাষা থেকে এর সৃষ্টি। তবে ১৮২৮ সালে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই পাবনা তার নিজস্ব মহিমায় বিকশিত হতে শুরু করে।
পাবনার ঐতিহ্যের কথা তুললেই সবার আগে চোখে ভাসে ব্রিটিশ প্রকৌশলবিদ্যার বিস্ময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ১৯১৫ সালে নির্মিত এই রেল সেতুটি আজও পদ্মার ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশেই রয়েছে লালন শাহ সেতু, যা আধুনিক ও প্রাচীন স্থাপত্যের এক দারুণ মেলবন্ধন। এছাড়া ঈশ্বরদীর পাকশীতে অবস্থিত উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন রেলওয়ে জংশন এবং বিভাগীয় কার্যালয় এই অঞ্চলের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পাবনা শহর থেকে সামান্য দূরেই অবস্থিত জোড় বাংলা মন্দির, যা পোড়ামাটির কারুকাজের এক অনন্য উদাহরণ। এছাড়া চাটমোহরের শাহী মসজিদ মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর জানান দেয়। অন্যদিকে, পাবনার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে আছে শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সৎসঙ্গ আশ্রম। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই আশ্রমটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।
পাবনার রয়েছে এক ঈর্ষণীয় সাংস্কৃতিক পটভূমি। মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের পৈতৃক নিবাস এই পাবনাতেই। এছাড়া বাংলা সাহিত্যের দিকপাল প্রমথ চৌধুরী ও সাংবাদিকতার অগ্রদূত কাঙাল হরিনাথের স্মৃতিধন্য এই জেলা।
অর্থনৈতিকভাবেও পাবনা স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ জেলাকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘দুগ্ধ ভাণ্ডার’। ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরের ঘি এবং দুগ্ধজাত পণ্য দেশজুড়ে সমাদৃত। এছাড়া পাবনার তাঁতের শাড়ি ও হোসিয়ারি শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখে চলেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমানে পাবনাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক পরিচিতি দিয়েছে।
পদ্মার ঢেউ আর তাঁতের খটখট শব্দে ঘেরা পাবনা কেবল একটি জেলা নয়, বরং বাঙালির বীরত্ব ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। এই জেলার ইতিহাস সংরক্ষণ করা বর্তমান প্রজন্মের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পাবনার এই পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
