বিশেষ প্রতিবেদন

স্বাধীনতার পর প্রথম বিজয়ী এমপি বিরোধী দলে

প্রকাশিত: ১০:৩৮ এএম, ৬ মার্চ ২০২৬, হালনাগাদ: ১০:৪১ এএম, ৬ মার্চ ২০২৬

৪৬ বছর পরও বিজয়ের সুখ পাখিটা বিএনপির অধরা!

·         বিশেষ প্রতিনিধি

·        সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত পাবনা-১ আসন নিয়ে। এর অন্যতম কারণ ছিল এবারের নির্বাচনে দীর্ঘ ৪৬ বছর পর বিএনপি এবং ২০ বছর পর জামায়াতের এ আসনটি পুনরুদ্ধার করার লড়াই; কিন্তু শেষ লড়াইয়ে বিজয়ের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী আসনটি পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

পাশাপাশি শত সম্ভাবনা সত্ত্বেও আসনটি অধরাই থেকে গেছে বিএনপির। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশার শেষ নেই দলের প্রার্থীসহ নেতাকর্মী এবং সমর্থকদের।

এদিকে নির্বাচনের পরও পাবনা-১ আসন নিয়ে আলোচনা থামছে না। এর কারণ হলো স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম ওই আসনের বিজয়ী এমপি বিরোধী দলে। এবারের নির্বাচনে পাবনা-১ আসনে বিজয়ী হন জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৭৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের শামসুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৪ হাজার ২৪৫ ভোট। অর্থাৎ ২৫ হাজার ৭২৯ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী নাজিবুর রহমান মোমেন।

এদিকে পাবনার অন্য দুটি আসনে (পাবনা-৩ ও পাবনা-৪) জামায়াত প্রার্থীরা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগির পরও পোস্টাল ব্যালটের ভোটসহ মাত্র ৩-৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হলেও পাবনা-১ আসনে কেন এত বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয় হলো-এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, জাতীয় নির্বাচনে পাবনা-১ আসনটি সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। কেননা স্বাধীনতার পর থেকে বিগত সরকার পর্যন্ত সব নির্বাচনে পাবনা-১ আসনে যে দল বিজয়ী হয়েছে সেই দল সরকার গঠন করেছে। শুধু তাই নয়, সরকার গঠনের পর এ আসনের বিজয়ী সব এমপি সরকারের মন্ত্রিত্বের স্বাদ পেয়েছেন।

কিন্তু এবারই হয়েছে ব্যতিক্রম। কেননা এবারের নির্বাচনে পাবনা-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী বিজয়লাভ করলেও সরকার গঠন করছে বিএনপি। এসব দিক বিবেচনায় ভোট শেষ হলেও এ আসন নিয়ে আলোচনা চলছেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাবনা-১ আসনে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয়ের বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়। প্রথমত, স্বাধীনতার পর থেকে পুরো সাঁথিয়া উপজেলা এবং পাশের বেড়া উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন ও বেড়া পৌরসভা নিয়ে ছিল পাবনা-১ আসন; কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে উচ্চ আদালতে এক রিট পিটিশনের রায়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র সাঁথিয়া উপজেলাকে নিয়ে পাবনা-১ আসন ঘোষণা করে ইসি সীমানা নির্ধারণ করে। ইসির  সিদ্ধান্তের পর জামায়াত খুশি হলেও ক্ষুব্ধ হয় বিএনপি এবং বিএনপির পক্ষ থেকে আন্দোলন করা হলেও শেষ পর্যন্ত যথাযথ উদ্যোগের অভাবে ইসির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। আর এতেই প্রথম দফা কপাল পোড়ে বিএনপি প্রার্থীর।

কেননা বেড়া উপজেলাকে বিএনপির দুর্গ হিসেবে মনে করা হলেও নির্বাচনের আগে বেড়ার অংশ পাবনা-১ আসন থেকে বিযুক্ত হয়। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে মনে করা হয়, সাঁথিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপি থেকে তুলনামূলক দুর্বল ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পাশাপাশি সাঁথিয়ার সন্তান মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন পাবনা-১ আসনে দুইবারের এমপি এবং শিল্প ও কৃষিমন্ত্রী। নিজামীর কারণে সাঁথিয়ায় জামায়াতের বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে।

নিজামীর ছেলে নবাগত হলেও তিনি ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় জোরে সোরে জনসংযোগ করেন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের আস্তাভাজন হয়ে উঠতে সক্ষম হন। এছাড়াও নির্বাচনের আগে জামায়াত প্রার্থীর সমর্থনে দলের একাধিক কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতা জনসভাসহ প্রচার-প্রচারণায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিলেও বিএনপি প্রার্থীর প্রচারে উল্লেখযোগ্য কেউ আসেননি।

এ ব্যাপারে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী শামসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বেশ কয়েক কেন্দ্রে রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ঢোকানো হয়। তার কর্মীদের রাতে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভয় ভীতি দেখানো, পিটিয়ে আহত করা করা, তার কর্মীদের কাছ থেকে জোর করে ভোটার তালিকা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে বারবার ইউএনও এবং ওসিকে বলা হলেও রহস্যজনক কারণে তারা আমলে নেননি।

বিএনপি প্রার্থী অভিযোগ করেন, দলের অন্য প্রার্থীরা যারা মনোনয়ন পাননি, তারা কেউ আমার পক্ষে কাজ করেনেনি। বরং ভোট বিক্রি করে দিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পাবনা-১ আসনে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির মির্জা আব্দুল আউয়াল, ১৯৮৬ সালে এরশাদের লাঙ্গল মার্কা প্রতীকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের, ১৯৯১ সালে জামায়াতের মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, ২০০১ সালে মাওলানা নিজামী এবং ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে (যদিও কয়েকটি নির্বাচন বিতর্কিত) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু বিজয়ী হন।

এ আসনে ১৯৭৯ সালের পর আর কখনো বিএনপির দলীয় প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেনি। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ২০০১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া (এরশাদ সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী) মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাসিত হন এবং সিরাজগঞ্জের চৌহালী থেকে বিএনপির টিকিটে বিজয়ী হন।

ওই সময় ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন জামায়াতের মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটমুক্ত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পাশাপাশি বিএনপির সমর্থকরা নিজেদের প্রার্থীর বিজয় দেখতে আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ের সুখ পাখিটা ৪৬ বছর পরও হাতছাড়া হয়ে গেল বিএনপির।

এদিকে পাবনার অন্য দুটি আসনের চেয়ে তুলনামূলক বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ে কী কারিশমা ছিল- সেই বিষয়ে জানতে জামায়াতের বিজয়ী প্রার্থী নাজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে জামায়াত সমর্থকদের দাবি ২০ বছর আগের চেয়ে জামায়াত এখন অনেক বেশি সংগঠিত এবং শক্তিশালী। তাছাড়া মানুষের পরিবর্তন চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একজন যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় তারা ২০ বছর পর হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে।

ADVERTISEMENT(970X90)

আরও পড়ুন